Episode 13604 words0 views

পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাব

পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাব আমাদের পাড়ার নাম ‘শান্তিনিবাস কলোনি’, যদিও এখানে শান্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। আর এই অশান্তির মূল কারণ হলো ‘পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাব’। এই ক্লাবের সদস্যরা হলেন পাড়ার চারজন অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ ব্যক্তি, যারা তাদের অফুরন্ত অবসর সময়কে “ফলপ্রসূ” করার জন্য বদ্ধপরিকর। তাদের সকাল শুরু হয় ক্লাবের পুরনো টিনের চালে ঢাকা ঘরে, যেখানে একটি ভাঙা টেবিল আর চারটি নড়বড়ে চেয়ার পাতা আছে। এখানে তারা চা আর বিস্কুট সহযোগে পাড়ার যাবতীয় গুজব, ছোটখাটো ঝগড়া এবং সম্ভাব্য রহস্য নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। টিনের চালের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ে ধুলোমাখা বাতাসে, যা তাদের গোয়েন্দাগিরির পরিবেশকে আরও রহস্যময় করে তোলে। ক্লাবের প্রধান স্তম্ভ এবং স্বঘোষিত সভাপতি হলেন নিতাইবাবু। তার মতে, শার্লক হোমস আর ফেলুদা নাকি তার কাছে শিশু! নিতাইবাবুর বয়স প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই, কিন্তু তার উদ্দীপনা দেখলে মনে হয় যেন সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া তরুণ। তিনি সব সময় একটি পুরনো, ভাঙাচোরা ম্যাগনিফাইং গ্লাস আর একটি ছোট ডায়েরি নিয়ে ঘোরেন, যেখানে তিনি তার “গুরুত্বপূর্ণ” ক্লুগুলো টুকে রাখেন। তার চোখে সব কিছুই রহস্যময়, এমনকি রাস্তার কুকুরের লেজ নাড়ানোও তার কাছে কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত বলে মনে হয়। তার প্রিয় উক্তি হলো, “একটি ছোট পিঁপড়ের গতিবিধিও একজন প্রকৃত গোয়েন্দার চোখ এড়াতে পারে না!” তিনি প্রায়শই গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকার ভান করে কপালে ভাঁজ ফেলে বসে থাকেন। দ্বিতীয় সদস্য হলেন শশীদা, যিনি ক্লাবের সবচেয়ে শান্ত এবং বিচক্ষণ সদস্য। তিনি কম কথা বলেন, কিন্তু তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অসাধারণ। তার চশমার ফাঁক দিয়ে তিনি এমন সব জিনিস দেখে ফেলেন যা নিতাইবাবুর ম্যাগনিফাইং গ্লাসেও ধরা পড়ে না। তবে তিনি সহজে মুখ খোলেন না, যতক্ষণ না একেবারে নিশ্চিত হন। তার এই নীরবতা নিতাইবাবুর কাছে প্রায়শই বিরক্তির কারণ হয়। নিতাইবাবু প্রায়শই তাকে ‘নীরব দর্শক’ বা ‘অতিরিক্ত মাল’ বলে টিপ্পনী কাটেন। শশীদা সাধারণত একটি পুরনো খবরের কাগজ হাতে বসে থাকেন, কিন্তু তার চোখ ঠিকই পাড়ার সবকিছু স্ক্যান করতে থাকে, যেন তিনি কোনো অদৃশ্য ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছেন। তৃতীয়জন হলেন কালীপদ, ক্লাবের সবচেয়ে উৎসাহী এবং অস্থিরমতি সদস্য। তিনি সব সময়ই কিছু না কিছু ভুল করে বসেন, কিন্তু তার উদ্দীপনার কোনো কমতি নেই। যেকোনো কেস হাতে এলেই তিনি সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়েন, আর তার ভুল ক্লুগুলো নিতাইবাবুর ভুল ধারণাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। কালীপদর বয়স ষাটের কোঠায়, কিন্তু তার চঞ্চলতা দেখলে তাকে চল্লিশের বেশি মনে হয় না। তার স্লোগান হলো, “দ্রুত পদক্ষেপ, দ্রুত সমাধান!” যদিও তার দ্রুত পদক্ষেপ প্রায়শই ভুল পথে চালিত করে এবং নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। তিনি প্রায়শই নিজের তৈরি করা ফাঁদে নিজেই ধরা পড়েন। আর সবশেষে, রমেনবাবু। তিনি হলেন ক্লাবের একমাত্র বাস্তববাদী সদস্য। নিতাইবাবুর আকাশকুসুম কল্পনা আর কালীপদর উদ্ভট ধারণাগুলোকে মাটিতে নামিয়ে আনার দায়িত্বটা যেন তারই। তিনি প্রায়শই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন এবং মনে মনে ভাবেন, এই বুড়ো বয়সে তার কপালে এমন পাগলামি কেন জুটল! রমেনবাবু একজন প্রাক্তন সরকারি কর্মচারী, তাই তার মধ্যে একটা নিয়মনিষ্ঠা এবং যুক্তিবাদী মনোভাব রয়েছে। তিনি সব সময় হাতে একটি চায়ের কাপ নিয়ে বসে থাকেন, যা তার বিরক্তিকে কিছুটা প্রশমিত করে। তার একমাত্র সান্ত্বনা হলো, ক্লাবের আড্ডায় অন্তত তার সকালের চাটা বিনা পয়সায় জোটে। ক্লাবটি গড়ে ওঠার পর প্রথম মাসখানেক তাদের কোনো “কেস” ছিল না। পাড়ায় কোনো বড় ধরনের অপরাধ ঘটত না, আর ছোটখাটো ঝগড়া-বিবাদগুলোও পাড়ার মুরুব্বিরাই মিটিয়ে ফেলতেন। নিতাইবাবু এতে বেশ হতাশ ছিলেন। “আহা, একটা ছোটখাটো চুরিও কি হয় না!” তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করতেন। তার মনে হতো, তার গোয়েন্দা প্রতিভা যেন অকারণে নষ্ট হচ্ছে। তিনি এমনকি পাড়ার কুকুরদের মধ্যে মারামারি নিয়েও তদন্ত শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কে কাকে আগে তাড়া করেছে বা কার লেজ বেশি জোরে নড়েছে, যা রমেনবাবু কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। একবার তো তিনি পাড়ার একটি গাছের পাতা ঝরার কারণ নিয়েও গভীর তদন্ত শুরু করেছিলেন, ভেবেছিলেন এর পেছনে কোনো গোপন বার্তা লুকিয়ে আছে। অবশেষে, একদিন সেই কাঙ্ক্ষিত “কেস” এলো। পাড়ার সবচেয়ে অহংকারী এবং তার ল্যাংড়া আমের জন্য বিখ্যাত ক্ষান্ত পিসি হাঁফাতে হাঁফাতে ক্লাবের দরজায় এসে হাজির হলেন। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে। তার পরনের শাড়ি এলোমেলো, চুল উস্কোখুস্কো, আর চোখে জল। তার হাতে একটি শুকনো আমের ডাল, যা তিনি শোকের প্রতীক হিসেবে ধরে রেখেছিলেন, যেন তার সন্তান হারিয়েছে। “নিতাই! ও নিতাই!” ক্ষান্ত পিসি চিৎকার করে উঠলেন, তার কণ্ঠস্বরে যেন পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ মিশে আছে, “আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে! আমার ল্যাংড়া আম! সব গায়েব! একটাও নেই! আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব! আমার সারা বছরের পরিশ্রম!” নিতাইবাবু এক লাফে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। এই তো সেই মুহূর্ত যার জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন! “ল্যাংড়া আম গায়েব? কী বলছেন পিসি? এ তো গুরুতর অপরাধ! পাড়ার ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে ঘটেনি! সতেরোটা ল্যাংড়া আম! এ তো রীতিমতো ডাকাতি! এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো বড় চক্র আছে!” শশীদা চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, “কবে থেকে গায়েব হলো পিসি? আর ক’টা আম ছিল?” “এই তো আজ সকালে! কাল রাতেও দেখেছিলাম, গাছে থোকা থোকা ঝুলছে, গুণে গুণে সতেরোটা ছিল! আমার নিজের হাতে গোনা! আজ সকালে উঠে দেখি, একটাও নেই! সব কটা চুরি হয়ে গেছে! আমার বুকের ধন! আমার সাধের ল্যাংড়া!” ক্ষান্ত পিসি কাঁদতে শুরু করলেন। তার ল্যাংড়া আমগুলো তার কাছে সন্তানের মতো প্রিয় ছিল, যা তিনি বহু যত্ন করে বড় করেছিলেন, সারাবছর পরিচর্যা করতেন। নিতাইবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, “চিন্তা করবেন না পিসি। পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাব থাকতে আপনার আম চুরি হবে, এ হতে পারে না! আমরা এর কিনারা করবই। চোরকে আমরা খুঁজে বের করবই, সে যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন! সে পাতালেও লুকিয়ে থাকলে আমরা তাকে টেনে বের করব! হয়তো সে কোনো গুপ্ত সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়েছে!” তদন্ত শুরু হলো। প্রথমে তারা গেলেন ক্ষান্ত পিসির বাড়ির পেছনের আমগাছের কাছে। গাছটি ছিল বেশ উঁচু এবং ফলন্ত, তার ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে ছিল। নিতাইবাবু তার ম্যাগনিফাইং গ্লাস বের করে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়লেন। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে মাটি পরীক্ষা করতে লাগলেন, যেন সেখানে কোনো গুপ্তধন লুকিয়ে আছে। “হুমম… এখানে পায়ের ছাপ আছে,” তিনি বিড়বিড় করলেন, “মনে হচ্ছে, চোর খালি পায়ে এসেছিল। আর এই যে, একটা সুতো! সম্ভবত চোর লুঙ্গি পরে এসেছিল! লুঙ্গি পরে খালি পায়ে আম চুরি… এ তো এক নতুন ধরনের অপরাধী! সম্ভবত কোনো ভবঘুরে, যে রাতে এখানে আশ্রয় নিয়েছিল! অথবা কোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর কাজ!” রমেনবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “নিতাই, পাড়ার সব লোকই তো খালি পায়ে হাঁটে আর লুঙ্গি পরে! এটা কোনো ক্লু হলো না। তাছাড়া, এখানে তো কুকুরের পায়ের ছাপও আছে, আর একটা মুরগিও হেঁটে গেছে। আর ওই সুতোটা তো ক্ষান্ত পিসিরই পুরনো শাড়ির পাড়।” “চুপ করো রমেন! তুমি গোয়েন্দা বিদ্যার কী বোঝো? কুকুরের পায়ের ছাপ তো থাকবেই, কুকুর তো আর চুরি করে না! আর মুরগি? মুরগি কি আম খায় নাকি?” নিতাইবাবু ধমক দিলেন। “এই সুতোটা সাধারণ নয়, এর মধ্যে একটা বিশেষ গন্ধ আছে, যেটা শুধু পেশাদার চোরদের লুঙ্গিতেই পাওয়া যায়! এই গন্ধটা আমি চিনি, এটা চোরের ঘামের গন্ধ!” তিনি সুতোটা শুঁকে নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। কালীপদ গাছের ডালে ঝুলতে থাকা একটি ছেঁড়া গেঞ্জি দেখে চিৎকার করে উঠলেন, “পেয়ে গেছি! এটাই চোরের গেঞ্জি! এই গেঞ্জি তো আমাদের বিশুর! আমি নিশ্চিত, বিশুই চোর! ও তো সব সময়ই গাছের ডালে চড়ে! ওর হাতেই তো সেদিন আম দেখেছিলাম!” বিশুকে পাড়ার সবাই চেনে। সে একটু দুষ্টু প্রকৃতির ছেলে, কিন্তু চুরি করার মতো সাহস তার নেই। নিতাইবাবু গেঞ্জিটা হাতে নিয়ে শুঁকে বললেন, “হুমম… বিশুর গেঞ্জি, আর এতে আমের গন্ধ! কেস সলভড! বিশুই চোর! তার মানে বিশু খালি পায়ে লুঙ্গি পরে গেঞ্জি খুলে আম চুরি করছিল! এ তো রীতিমতো ফিল্মি স্টাইল! হয়তো কোনো সিনেমার দৃশ্য দেখে প্রভাবিত হয়েছে!” রমেনবাবু মাথা চাপড়ালেন। “নিতাই, বিশু তো রোজই আম পাড়ে। আর এই গেঞ্জিটা তার শুকোতে দেওয়া ছিল, কাল রাতে ঝড়ে উড়ে এসেছে। আর আমের গন্ধ তো থাকবেই, বিশু তো আম খায়, আর ক্ষান্ত পিসি নিজেই ওকে আম দেন। ও তো নিজেই বলল।” কিন্তু নিতাইবাবু শুনলেন না। তিনি কালীপদকে নিয়ে বিশুর বাড়িতে হানা দিলেন। বিশু তখন গভীর ঘুমে মগ্ন, তার চারপাশে কমিকসের বই ছড়ানো। নিতাইবাবু তাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে বললেন, “বলো, আম কোথায় রেখেছ? স্বীকার করো! ক্ষান্ত পিসির সতেরোটা ল্যাংড়া আম কোথায়? আমরা সব জানি! তোমার গেঞ্জি আর আমের আঁটিই তোমার বিরুদ্ধে প্রমাণ!” বিশু অবাক হয়ে বলল, “কিসের আম? আমি তো কিছু জানি না। আমি তো কাল রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আর আমি তো ল্যাংড়া আম খাই না, আমার কাঁচা আম ভালো লাগে।” নিতাইবাবু তার পকেট থেকে একটা ল্যাংড়া আমের আঁটি বের করে বললেন, “এটা কী? এটা তো ক্ষান্ত পিসির আমের আঁটি! অস্বীকার করতে পারবে?” বিশু হেসে ফেলল। “আরে নিতাইকাকু, এটা তো আমি কাল দুপুরে খেয়েছি। ক্ষান্ত পিসি নিজেই তো আমাকে দুটো আম দিয়েছিলেন! আমি তার বাগান পরিষ্কার করে দিয়েছিলাম তো, তাই খুশি হয়ে দিয়েছিলেন। এই তো, তার চিহ্ন এখনও আমার হাতে লেগে আছে।” বিশু তার হাতে লেগে থাকা আমের আঠার দাগ দেখাল। এই তথ্য শুনে ডিটেক্টিভ ক্লাবের সদস্যরা কিছুটা দমে গেলেন। তাদের প্রথম “কেস” প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছিল। কিন্তু নিতাইবাবু হাল ছাড়ার পাত্র নন। “ঠিক আছে, বিশু চোর না। কিন্তু আমগুলো তো গায়েব! নিশ্চয়ই কোনো পেশাদার চোরের কাজ! হয়তো কোনো আন্তঃরাজ্য আম চোর গ্যাং! তারা হয়তো রাতের অন্ধকারে ট্রাক নিয়ে এসেছিল! অথবা কোনো গুপ্তচর সংস্থা, যারা আমের মাধ্যমে কোনো গোপন বার্তা পাঠাতে চেয়েছিল!” তদন্তের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলো। এবার তারা পাড়ার প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, কেউ রাতে কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখেছে কিনা। তাদের প্রশ্নগুলো ছিল আরও অদ্ভুত এবং অপ্রাসঙ্গিক। “আপনার বাড়িতে কি কাল রাতে কোনো বিড়াল ডেকেছিল? বিড়াল ডাকলে চোর আসে, এটা প্রাচীন গোয়েন্দা তত্ত্ব।” “আপনার ছাদের উপর দিয়ে কি কোনো কাক উড়ে যেতে দেখেছেন? কাকের গতিবিধি সন্দেহজনক হতে পারে, তারা চোরদের বার্তা বহন করে। হয়তো তাদের পায়ে কোনো গোপন যন্ত্র লাগানো ছিল।” “আপনার বাড়িতে কি নতুন কোনো বাসন এসেছে? হয়তো চোর আম নিয়ে পালানোর সময় আপনার বাসন ফেলে গেছে, বা আম রাখার জন্য নতুন পাত্র কিনেছে। সেগুলোর উপর কি আমের রস লেগে আছে?” “আপনার বাড়ির রং কি কাল রাতে একটুও পাল্টেছে? চোরেরা ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে, হয়তো তারা রং পরিবর্তনকারী পোশাক পরেছিল।” পাড়ার লোক তাদের প্রশ্ন শুনে হাসত। কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে তাড়িয়ে দিত। কেউ কেউ ভাবত, বুড়ো বয়সে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তদন্তের তৃতীয় দিনে, কালীপদ একটি নতুন ক্লু নিয়ে এলেন। তিনি হাঁফাতে হাঁফাতে ক্লাবে ঢুকলেন। “নিতাইদা! আমি দেখেছি! আমাদের সুবলদার বাড়িতে কাল রাতে অনেক আমের খোসা ফেলা ছিল! সুবলদাই চোর! তিনি নিরীহ সেজে আছেন, কিন্তু আসলে তিনি একজন পাকা চোর! তার মুখে কেমন যেন চোরের ছাপ!” সুবলদা পাড়ার সবচেয়ে নিরীহ মানুষ। তিনি একজন স্কুল শিক্ষক, যিনি শিশুদের নীতিশিক্ষা দেন। নিতাইবাবু তার বাড়িতে গিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, তার চোখে সন্দেহ আর অভিযোগের আগুন। “সুবলবাবু, আপনি কি ক্ষান্ত পিসির সতেরোটা ল্যাংড়া আম চুরি করেছেন? স্বীকার করুন, আমরা সব জানি! আপনার বাড়িতে আমের খোসা পাওয়া গেছে!” সুবলদা অবাক হয়ে বললেন, “কিসের আম? আমি তো আম খাই না। আমার দাঁতে ব্যথা। আর সতেরোটা আম? আমি তো একটাও খাই না, এমনকি গন্ধও শুঁকি না। আমার তো আমে অ্যালার্জি।” “তাহলে এত খোসা এলো কোত্থেকে?” নিতাইবাবু চ্যালেঞ্জ করলেন, তার কণ্ঠস্বরে বিজয়ীর সুর। সুবলদার স্ত্রী হেসে বললেন, “আরে নিতাইদা, ওগুলো তো আমার ভাইয়ের বাড়ির আম। আমার ভাই কাল রাতে আমাদের জন্য এক ঝুড়ি আম পাঠিয়েছিল। আমরা সবাই মিলে খেয়েছি। প্রায় কুড়িটা আম ছিল। এই দেখুন, এখনও কিছু আম ফ্রিজে আছে।” তিনি ফ্রিজ খুলে কয়েকটি তাজা আম দেখালেন। নিতাইবাবু আবার চুপ হয়ে গেলেন। রমেনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “নিতাই, এবার ক্ষান্ত পিসিকে গিয়ে বলো যে আমগুলো হয়তো ভূত চুরি করেছে। তোমার গোয়েন্দাগিরি দিয়ে কিছু হবে না। শুধু পাড়ার লোকের কাছে হাসির পাত্র হচ্ছো।” কিন্তু ঠিক তখনই, শশীদা, যিনি এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিলেন, হঠাৎ বলে উঠলেন, “ক্ষান্ত পিসি, আপনার বাড়ির পেছনে যে নতুন বিদ্যুৎ খুঁটিটা বসানো হয়েছে, সেটা দেখেছেন?” ক্ষান্ত পিসি অবাক হয়ে বললেন, “হ্যাঁ, দেখেছি। তাতে কী?” “ওই খুঁটির তারগুলো কি আপনার আমগাছের ডাল ছুঁয়ে আছে?” শশীদা প্রশ্ন করলেন, তার চোখে এক ঝলক বুদ্ধিদীপ্ত হাসি। ক্ষান্ত পিসি একটু ভেবে বললেন, “হ্যাঁ, মনে হয় আছে। নতুন খুঁটি তো, তাই তারগুলো গাছের কাছাকাছি। গাছটা তো অনেক বড়।” শশীদা বললেন, “কাল রাতে কি খুব ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল?” “হ্যাঁ, হয়েছিল তো। খুব জোরে বাতাস ছিল। আর বিদ্যুৎও চলে গিয়েছিল অনেকক্ষণ। গাছপালা সব দুলে উঠেছিল।” শশীদা মুচকি হেসে বললেন, “আমার মনে হয়, কাল রাতে ঝড়ে আমগুলো তারে লেগে ছিঁড়ে গেছে। আর তারগুলো যেহেতু আপনার উঠোনের বাইরে দিয়ে গেছে, তাই আমগুলো সোজা রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। আর পাড়ার ছেলেরা সেগুলোকে কুড়িয়ে নিয়েছে। সতেরোটা আম হয়তো ঝড়ে পড়েছিল, আর বিশু তো দুটো আম আগেই পেয়েছিল। তাই মোট উনিশটা আম।” নিতাইবাবু, কালীপদ এবং রমেনবাবু সবাই অবাক হয়ে শশীদার দিকে তাকালেন। ক্ষান্ত পিসি দৌড়ে গিয়ে দেখলেন, সত্যিই তাই! নতুন বিদ্যুৎ খুঁটির তারগুলো তার আমগাছের ডাল ছুঁয়ে আছে, আর কিছু ছেঁড়া পাতা ও ছোট ডাল এখনও তারে লেগে আছে। তিনি বাইরে গিয়ে পাড়ার ছেলেদের জিজ্ঞাসা করতেই জানা গেল, কাল রাতে ঝড়ের পর অনেকেই রাস্তায় পড়ে থাকা আম কুড়িয়ে নিয়েছিল। কেউ কেউ তো খুশি হয়ে বলেছিল, “ঝড় না হলে তো এত ভালো আম পেতাম না!” ক্ষান্ত পিসি প্রথমে কিছুটা হতাশ হলেন, তার ল্যাংড়া আমগুলো এভাবে নষ্ট হয়ে গেল ভেবে, কিন্তু তারপর হাসতে শুরু করলেন। “আরে বাবা! আমি এত চিন্তা করছি, আর আমগুলো কিনা ঝড়ে পড়ে গেছে! ধন্যি আমার কপাল! আর আমি কিনা তোমাদের এত কষ্ট দিলাম! তোমরা তো সব গোয়েন্দা!” নিতাইবাবু প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হলেও, দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি বুক ফুলিয়ে বললেন, “দেখেছেন পিসি? পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাবের বুদ্ধির জোরেই তো এই রহস্যের সমাধান হলো! শশী, তুমি তো দারুণ কাজ করেছ! আমারই তো সব প্ল্যান ছিল, তুমি শুধু সেটাকে কাজে লাগিয়েছ! আমরা তো জানতামই যে ঝড়েই আম পড়েছে, শুধু প্রমাণ খুঁজছিলাম! আমাদের গোয়েন্দা কৌশল এমনই যে আমরা সব দিক থেকে বিচার করি।” রমেনবাবু আর কালীপদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাব তাদের প্রথম “কেস” সমাধান করে মহা খুশি। যদিও তাদের গোয়েন্দাগিরির কারণে রহস্য সমাধান হয়নি, বরং শশীদার সাধারণ পর্যবেক্ষণই কাজটা সেরে দিয়েছে, তবুও তারা নিজেদেরকে পাড়ার সেরা গোয়েন্দা মনে করতে লাগলেন। দ্বিতীয় কেস: হারানো তোতা পাখি আম চুরির কেস শেষ হতে না হতেই, ক্লাবের সামনে হাজির হলেন পাড়ার নতুন বাসিন্দা, সেনগুপ্ত দম্পতি। তারা সম্প্রতি এই পাড়ায় এসেছেন এবং তাদের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। সেনগুপ্ত গিন্নির চোখে জল, আর সেনগুপ্ত মশাই অস্থিরভাবে তার গোঁফ পাকাচ্ছিলেন, যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে। “নিতাইবাবু,” সেনগুপ্ত গিন্নি বললেন, তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, “আমাদের মিঠু! আমাদের মিঠু পাখিটা নেই! কাল রাত থেকে তাকে খুঁজে পাচ্ছি না! সে আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়!” মিঠু ছিল তাদের আদরের তোতা পাখি, যে অনর্গল কথা বলতে পারত এবং প্রায়শই পাড়ার লোকেদের নাম ধরে ডাকত, এমনকি তাদের গোপন কথাও ফাঁস করে দিত। তার গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল সবুজ, আর ঠোঁট ছিল লাল টুকটুকে। সে নাকি ‘কাকু, চা দাও’ বলার পাশাপাশি ‘সেনগুপ্ত মশাই, আজ বাজার থেকে ইলিশ আনবেন’ – এমন কথাও বলত। নিতাইবাবু আবার তার গোয়েন্দা মোডে চলে গেলেন। তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। “তোতা পাখি গায়েব? এ তো আরও গুরুতর অপরাধ! পাখি চুরি! এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের হাত আছে! তারা হয়তো মিঠুর কথা বলার ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে চায়! হয়তো মিঠু কোনো গোপন তথ্য জানে! হয়তো সে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সাক্ষী!” রমেনবাবু কপালে হাত দিলেন। “নিতাই, পাচারকারী চক্র কেন তোতা পাখি চুরি করবে? হয়তো উড়ে গেছে। আর গোপন তথ্য? মিঠু তো শুধু ‘কাকু, চা দাও’ বলতে পারে, আর বড়জোর ‘সেনগুপ্ত মশাই, আজ বাজার থেকে ইলিশ আনবেন’।” “উড়ে গেছে? অসম্ভব! মিঠু তো খাঁচা থেকে বের হতো না! তার ডানাও কাটা ছিল! সে উড়তে পারে না!” নিতাইবাবু বললেন। “শুরু করো তদন্ত! শশী, তুমি পাখির গতিপথ বিশ্লেষণ করো। কালীপদ, তুমি পাড়ার সব বাড়ির ছাদে খোঁজ নাও। রমেন, তুমি সম্ভাব্য চোরদের তালিকা তৈরি করো।” তদন্ত শুরু হলো। নিতাইবাবু পাখির খাঁচার কাছে গিয়ে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পালক খুঁজতে লাগলেন। “হুমম… এখানে কিছু পালক আছে, কিন্তু এগুলো মিঠুর পালক নয়! এগুলো কাকের পালক! তার মানে কাকের ছদ্মবেশে কোনো চোর এসেছিল! অথবা কোনো কাক মিঠুকে অপহরণ করেছে! হয়তো কাকেরা মিঠুর কথা বলার ক্ষমতা দেখে হিংসা করত!” তিনি একটি কাকের পালক হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। কালীপদ পাড়ার প্রতিটি বাড়ির ছাদে উঠে হাঁকডাক শুরু করলেন, “মিঠু! ও মিঠু! কোথায় তুমি? কথা বলো! কাকু ডাকছে!” তার চিৎকারে পাড়ার কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করল, আর কিছু লোক জানালা খুলে উঁকি মেরে দেখল কী হচ্ছে। কালীপদ এমনকি একটি গাছের ডালে উঠে পাখির মতো ডাকতে শুরু করলেন, যদি মিঠু সাড়া দেয়। তিনি নিজেও প্রায় পাখির মতো দেখতে লাগলেন। রমেনবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “নিতাই, কাকের ছদ্মবেশে চোর? তুমি কি হিন্দি সিনেমা দেখছো নাকি? আর কালীপদ, তুমি তো পুরো পাড়াকে জাগিয়ে তুলছো। লোকে ভাবছে পাগল হয়ে গেছো।” শশীদা চুপচাপ সেনগুপ্ত দম্পতির বাড়ির চারপাশে ঘুরছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, বাড়ির পেছনের দিকে একটি পুরনো, অব্যবহৃত চিলেকোঠা আছে, যার জানালাটি খোলা। জানালাটি ধুলো আর মাকড়সার জালে ঢাকা, কিন্তু তার দৃষ্টি এড়ালো না। তিনি আরও লক্ষ্য করলেন, চিলেকোঠার নিচে কিছু পাখির বিষ্ঠা পড়ে আছে, যা মিঠুর বিষ্ঠার মতোই দেখতে। এদিকে, নিতাইবাবু আর কালীপদ পাড়ার এক চায়ের দোকানে বসে সম্ভাব্য চোরদের নিয়ে আলোচনা করছিলেন। “আমার মনে হয়, এটা বিশুর কাজ,” কালীপদ বললেন, “ও তো সব সময় দুষ্টুমি করে। হয়তো মিঠুকে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছে। ওর তো একটা পুরনো খাঁচা আছে।” “না কালীপদ, বিশু আম চুরি করেনি, পাখিও চুরি করবে না,” নিতাইবাবু বললেন। “আমার সন্দেহ, পাড়ার সেই নতুন ছেলেটা, যে রোজ বিকেলে সাইকেল চালায়। ওর চোখমুখ কেমন যেন সন্দেহজনক! ও তো নতুন এসেছে, পাড়ার নিয়মকানুন জানে না। হয়তো ও-ই মিঠুকে বিক্রি করে দিয়েছে! অথবা কোনো সার্কাসের লোক, যে মিঠুকে তার দলে নিতে চায়!” তারা যখন চায়ের দোকানে বসে চোর ধরার পরিকল্পনা করছিলেন, ঠিক তখনই শশীদা এসে হাজির হলেন। তার হাতে একটি ছোট, সবুজ পালক, যা মিঠুর পালকের মতোই দেখতে। “মিঠুকে পাওয়া গেছে,” শশীদা শান্তভাবে বললেন, তার মুখে মৃদু হাসি। নিতাইবাবু চমকে উঠলেন। “কোথায়? কে চোর? বলো, কে সেই আন্তর্জাতিক পাচারকারী?” শশীদা হেসে বললেন, “চোর কেউ নয়। মিঠু চিলেকোঠায় আটকে ছিল।” সবাই অবাক হয়ে শশীদার দিকে তাকালেন। শশীদা ব্যাখ্যা করলেন, “সেনগুপ্ত দম্পতি নতুন এসেছেন, তাই তারা বাড়ির সব কোণাচিহ্নেন না। কাল রাতে যখন খাঁচা পরিষ্কার করা হচ্ছিল, তখন মিঠু কোনোভাবে চিলেকোঠার খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। আর জানালাটা উঁচু হওয়ায় বের হতে পারেনি। আমি দেখলাম চিলেকোঠার জানালাটা খোলা, আর সেখানে কিছু সবুজ পালক পড়ে আছে।” সেনগুপ্ত দম্পতি দৌড়ে গিয়ে চিলেকোঠায় দেখলেন, সত্যিই মিঠু সেখানে বসে আছে, আর তাদের দেখে “মিঠু! মিঠু! চা দাও! ইলিশ আনবে!” বলে ডাকছে। তাদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। নিতাইবাবু প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হলেও, দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি বুক ফুলিয়ে বললেন, “দেখেছেন পিসি? পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাবের বুদ্ধির জোরেই তো এই রহস্যের সমাধান হলো! শশী, তুমি তো দারুণ কাজ করেছ! আমারই তো সব প্ল্যান ছিল, তুমি শুধু সেটাকে কাজে লাগিয়েছ! আমি তো জানতামই যে পাখিটা বাড়ির ভেতরেই আছে, শুধু সঠিক জায়গাটা খুঁজছিলাম! এই তো, আমাদের গোয়েন্দা কৌশল!” রমেনবাবু আর কালীপদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাব তাদের দ্বিতীয় “কেস” সমাধান করে মহা খুশি। যদিও তাদের গোয়েন্দাগিরির কারণে রহস্য সমাধান হয়নি, বরং শশীদার সাধারণ পর্যবেক্ষণই কাজটা সেরে দিয়েছে, তবুও তারা নিজেদেরকে পাড়ার সেরা গোয়েন্দা মনে করতে লাগলেন। তৃতীয় কেস: হারানো চশমা রহস্য মিঠুর কেস শেষ হতে না হতেই, ক্লাবের সামনে হাজির হলেন পাড়ার সবচেয়ে ভুলো মনের মানুষ, হরিপদবাবু। তার চোখ দুটো কুঁচকে আছে, আর তিনি বারবার হাত দিয়ে কপাল ঘষছেন। “নিতাই! নিতাইবাবু!” হরিপদবাবু প্রায় কেঁদে ফেললেন, “আমার চশমা! আমার চশমাটা খুঁজে পাচ্ছি না! সকাল থেকে কিছু দেখতে পাচ্ছি না! সব ঝাপসা লাগছে!” হরিপদবাবুর চশমা ছাড়া এক মুহূর্তও চলে না। তিনি চশমা ছাড়া নিজের পাড়ার রাস্তাটাও চিনতে পারেন না। নিতাইবাবু আবার তার গোয়েন্দা মোডে চলে গেলেন। “চশমা গায়েব? এ তো আরও গভীর ষড়যন্ত্র! চশমা চুরি! এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো আন্তর্জাতিক চশমা পাচারকারী চক্রের হাত আছে! তারা হয়তো এই চশমা দিয়ে কোনো গোপন কোড ডিকোড করবে!” রমেনবাবু এবার আর কপালে হাত দিলেন না, সরাসরি মাথায় হাত দিলেন। “নিতাই, চশমা পাচারকারী চক্র? হরিপদবাবুর চশমা তো পাঁচ টাকার পাওয়ারের, সেটা দিয়ে কী কোড ডিকোড করবে?” “চুপ করো রমেন! তুমি গোয়েন্দা বিদ্যার কী বোঝো? আপাতদৃষ্টিতে যা সাধারণ মনে হয়, তার পেছনেই লুকিয়ে থাকে গভীর রহস্য!” নিতাইবাবু ধমক দিলেন। “শুরু করো তদন্ত! শশী, তুমি চশমার গতিপথ বিশ্লেষণ করো। কালীপদ, তুমি পাড়ার সব বাড়ির ড্রয়ারে খোঁজ নাও। রমেন, তুমি সম্ভাব্য চোরদের তালিকা তৈরি করো।” তদন্ত শুরু হলো। নিতাইবাবু হরিপদবাবুর বাড়িতে গিয়ে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে প্রতিটি কোণা পরীক্ষা করতে লাগলেন। “হুমম… এখানে ধুলোর আস্তরণ আছে, কিন্তু কোনো পায়ের ছাপ নেই! তার মানে চোর অদৃশ্য ছিল! অথবা সে ছাদ থেকে নেমেছিল!” তিনি একটি পুরনো সংবাদপত্র হাতে নিয়ে শুঁকে বললেন, “এই সংবাদপত্রে চশমার গন্ধ আছে! তার মানে চোর সংবাদপত্র পড়ছিল!” কালীপদ পাড়ার প্রতিটি বাড়ির ড্রয়ার, আলমারি, এমনকি রান্নাঘরের হাঁড়িপাতিলের মধ্যেও চশমা খুঁজতে লাগলেন। তার চিৎকারে পাড়ার গৃহিণীরা বিরক্ত হয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলেন। “কালীপদ কাকু, তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? আমার রান্নাঘরে চশমা কী করবে?” রমেনবাবু বিরক্তি নিয়ে বললেন, “নিতাই, অদৃশ্য চোর? আর চোর সংবাদপত্র পড়ছিল? হরিপদবাবু তো নিজেই রোজ সংবাদপত্র পড়েন।” শশীদা চুপচাপ হরিপদবাবুর বাড়ির চারপাশে ঘুরছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, হরিপদবাবুর পড়ার টেবিলে একটি খোলা বই পড়ে আছে, আর তার ঠিক পাশে একটি চায়ের কাপ। কাপের কিনারে কিছু জল লেগে আছে। এদিকে, নিতাইবাবু আর কালীপদ পাড়ার এক চায়ের দোকানে বসে সম্ভাব্য চোরদের নিয়ে আলোচনা করছিলেন। “আমার মনে হয়, এটা সেই নতুন ছেলেটার কাজ,” কালীপদ বললেন, “ও তো সব সময় সাইকেল চালায়, হয়তো চশমাটা নিয়ে পালিয়েছে।” “না কালীপদ, ও তোতা পাখি চুরি করেনি, চশমাও চুরি করবে না,” নিতাইবাবু বললেন। “আমার সন্দেহ, পাড়ার সেই পুরনো ভিখারিটা। সে তো সব সময় কিছু না কিছু কুড়িয়ে বেড়ায়। হয়তো সে চশমাটা কুড়িয়ে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে!” তারা যখন চায়ের দোকানে বসে চোর ধরার পরিকল্পনা করছিলেন, ঠিক তখনই শশীদা এসে হাজির হলেন। তার হাতে একটি চায়ের কাপ। “হরিপদবাবুর চশমা পাওয়া গেছে,” শশীদা শান্তভাবে বললেন, তার মুখে মৃদু হাসি। নিতাইবাবু চমকে উঠলেন। “কোথায়? কে চোর? বলো, কে সেই আন্তর্জাতিক চশমা পাচারকারী?” শশীদা হেসে বললেন, “চোর কেউ নয়। চশমাটা হরিপদবাবুর নিজের চায়ের কাপের নিচে চাপা পড়েছিল।” সবাই অবাক হয়ে শশীদার দিকে তাকালেন। শশীদা ব্যাখ্যা করলেন, “হরিপদবাবু যখন সংবাদপত্র পড়ছিলেন, তখন তিনি চশমাটা খুলে পাশে রেখেছিলেন। তারপর চা খেতে গিয়ে ভুল করে চশমার উপর কাপটা রেখে দেন। তাই চশমাটা কাপের নিচে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।” হরিপদবাবু দৌড়ে গিয়ে দেখলেন, সত্যিই তাই! তার সাধের চশমাটা চায়ের কাপের নিচে চাপা পড়ে আছে। তিনি চশমাটা হাতে নিয়ে চোখে লাগিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। “আরে বাবা! আমি এতক্ষণ ধরে খুঁজে মরছি, আর চশমাটা কিনা এখানেই ছিল! ধন্যি আমার কপাল!” নিতাইবাবু প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হলেও, দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি বুক ফুলিয়ে বললেন, “দেখেছেন পিসি? পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাবের বুদ্ধির জোরেই তো এই রহস্যের সমাধান হলো! শশী, তুমি তো দারুণ কাজ করেছ! আমারই তো সব প্ল্যান ছিল, তুমি শুধু সেটাকে কাজে লাগিয়েছ! আমি তো জানতামই যে চশমাটা বাড়ির ভেতরেই আছে, শুধু সঠিক জায়গাটা খুঁজছিলাম! এই তো, আমাদের গোয়েন্দা কৌশল!” রমেনবাবু আর কালীপদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাব তাদের তৃতীয় “কেস” সমাধান করে মহা খুশি। যদিও তাদের গোয়েন্দাগিরির কারণে রহস্য সমাধান হয়নি, বরং শশীদার সাধারণ পর্যবেক্ষণই কাজটা সেরে দিয়েছে, তবুও তারা নিজেদেরকে পাড়ার সেরা গোয়েন্দা মনে করতে লাগলেন। পরের দিন সকালেই নিতাইবাবু ক্লাবের নোটিশ বোর্ডে নতুন ঘোষণা লাগালেন: “জরুরী ঘোষণা! পাড়ার ডিটেক্টিভ ক্লাব এখন থেকে পাড়ার সব হারানো জিনিসের তদন্ত করবে! কুকুর, বিড়াল, চশমা, এমনকি হারানো চাবিও! কোনো রহস্যই আমাদের চোখ এড়াবে না! আমরা এখন আন্তর্জাতিক স্তরেও কাজ করতে প্রস্তুত! এমনকি মহাকাশে হারানো জিনিসেরও তদন্ত করব!” পাড়ার লোকেরা আবার হাসতে শুরু করল। শান্তিনিবাস কলোনিতে শান্তি ফিরুক বা না ফিরুক, ডিটেক্টিভ ক্লাবের জন্য হাসির খোরাক যে কোনোদিন কমবে না, সেটা নিশ্চিত। এবং নিতাইবাবু নিশ্চিত, তার গোয়েন্দা জীবন সবে শুরু হয়েছে! হয়তো পরের বার তারা কোনো এলিয়েন আক্রমণের তদন্ত করবে, অথবা পাড়ার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কচ্ছপের রহস্য উন্মোচন করবে!

Share this story

Comments

Discussion

No comments

Please sign in to join the discussion