Episode 14193 words0 views

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা (The Dream Peddler) আমাদের এই ব্যস্ত শহর, যা প্রতিনিয়ত নতুন ইমারত আর প্রযুক্তিগত কোলাহলে তার পুরোনো সত্তাকে পেছনে ফেলে ছুটে চলেছে, তার এক কোণে টিকে ছিল এক অদ্ভুত, ফিসফিসানি কিংবদন্তি। শহরের বুকে, আধুনিকতার ঝলমলে আলোয় ঢাকা পড়েও, এক পুরোনো বিশ্বাস যেন অলক্ষ্যে ডালপালা মেলছিল। এই কিংবদন্তির প্রাণপুরুষ ছিলেন একজন বৃদ্ধ, সাদা চুলের রফিক চাচা। তার পোশাক ছিল সাদামাটা, চোখে ছিল এক নিস্তরঙ্গ প্রশান্তি, আর মুখে লেগে থাকত এক স্নিগ্ধ হাসি। শহরের অনেকেই তাকে ‘পাগল’ বলত, কারণ তিনি নাকি স্বপ্ন বিক্রি করতেন! কাঁধে তার একটা ময়লা মখমলের থলে ঝুলত, আর তার ভেতর সযত্নে রাখা থাকত শত শত কাঁচের শিশি। প্রতিটি শিশিতে যেন ধরা থাকত এক-একটি রঙবেরঙের স্বপ্ন—কখনও সফলতার ঝলমলে আলো, কখনও হারানো ভালোবাসার উষ্ণ স্মৃতি, কখনও বা শুধুই এক ঝলক অনাবিল শান্তি। রফিক চাচা কোনো নির্দিষ্ট দোকানে বসতেন না। তার দোকান ছিল এই বিশাল শহরটাই। তিনি শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতেন, কখনও জনাকীর্ণ বাজারে, কখনও নির্জন গলিপথে, কখনও পুরনো বইয়ের দোকানে, আবার কখনও সদ্য গজিয়ে ওঠা আধুনিক ক্যাফের সামনে। তার কণ্ঠস্বর ছিল অদ্ভুত শান্ত, কিন্তু তাতে কেমন যেন এক জাদু মিশে থাকত, যা শত কোলাহল ভেদ করেও কানে এসে পৌঁছাত। “স্বপ্ন কিনবেন, স্বপ্ন? জীবনের নতুন দিশা, ভবিষ্যতের রঙিন ছবি?” তার এই ডাক শুনে কেউ কৌতূহলী হয়ে থামত, কেউ বা নিছকই হেসে চলে যেত, কিংবা ভ্রু কুঁচকে পাশ কাটিয়ে যেত। কিন্তু যারা জীবনের একঘেয়েমি, দুঃখ বা অতৃপ্তি থেকে মুক্তির পথ খুঁজত, যারা নিজেদের হারিয়ে যাওয়া আশার ক্ষীণ আলোটুকু ফিরে পেতে চাইত, তারাই বুঝত রফিক চাচা আসলে কী বিক্রি করেন। তার কাছে ছিল এমনই সব স্বপ্ন, যা মানুষের সুপ্ত চেতনার গভীরে প্রবেশ করত, তাদের মনকে নাড়া দিত এবং ঘুম ভাঙার পর সেই স্বপ্নের রেশ তাদের দিনের প্রতিটি কাজে, প্রতিটি চিন্তায়, প্রতিটি পদক্ষেপে মিশে থাকত। শহরের এই হাজারো মানুষের ভিড়ে, এক তরুণী ছিল, যার নাম মীরা। বয়স পঁচিশ ছুঁইছুঁই। তার জীবন ছিল একটি ছকে বাঁধা, যেখানে কোনো বড় স্বপ্ন বা বিশেষ আকাঙ্ক্ষার ঠাঁই ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে সে একটি ছোট অ্যাকাউন্টিং ফার্মে কাজ করত, আর তার দিনগুলো কাটত ফাইল আর হিসেবের গোলকধাঁধায়। ঘুম থেকে ওঠা, অফিসে যাওয়া, হিসেব মেলানো, বাড়ি ফিরে আসা—এই ছিল তার প্রতিদিনের রুটিন। ছোটবেলা থেকেই সে ভাবত, জীবনটা শুধু কিছু রুটিন কাজ আর দায়িত্বের সমষ্টি, যেখানে কল্পনার কোনো স্থান নেই। তার শিল্পকলার প্রতি একটা গোপন টান ছিল, চারুকলায় ভর্তি হওয়ার একটা অদম্য ইচ্ছা ছিল, যা সে কখনো গুরুত্ব দেয়নি, বরং হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। ‘এসব করে কি আর জীবন চলে?’—এই ছিল তার মধ্যবিত্ত মানসিকতার সহজ প্রশ্ন। একদিন দুপুরে, যখন মীরা তার জানালার ধারে বসে অলস চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল, তার হাতে ছিল একটি অর্ধসমাপ্ত রিপোর্ট, যা তাকে আরও একঘেয়ে করে তুলছিল। হঠাৎই সে রফিক চাচাকে দেখতে পেল। তার কণ্ঠস্বরের মায়া যেন জানালা ভেদ করে মীরার কানে এসে লাগল। কৌতূহলবশত সে রফিক চাচাকে ডাকল। তার মনে এক নিছক মজার চিন্তা কাজ করছিল, দেখা যাক এই বৃদ্ধ কী উদ্ভট কথা বলে। “চাচা, আপনি কী বিক্রি করেন?” মীরা জিজ্ঞেস করল, তার কণ্ঠে ছিল হালকা উপহাসের সুর, যা সে লুকানোর চেষ্টা করেনি। রফিক চাচা মৃদু হাসলেন, তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা, যা মীরার উপহাসকে গিলে ফেলল। “আমি স্বপ্ন বিক্রি করি, মা। এমন স্বপ্ন যা তোমার জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে দিতে পারে, যা তোমার ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলবে।” তিনি মীরার দিকে এগিয়ে এলেন, তার চোখে চোখ রেখে এমনভাবে তাকালেন যেন তিনি মীরার ভেতরের অদেখা কোনো কিছুকে দেখতে পাচ্ছেন। মীরা প্রথমে হেসেছিল। স্বপ্ন কি বিক্রি করা যায়? এটা তো নিছকই ছেলেমানুষি, একটা ভণ্ডামি! কিন্তু রফিক চাচার শান্ত চোখে কেমন যেন এক গভীর জাদু ছিল। তার সেই হাসি আর দৃষ্টি মীরার ভেতরের অবিশ্বাসের দেয়ালটা যেন একটু একটু করে নড়তে শুরু করল। ইতস্তত করে সে রফিক চাচার কাছে এগিয়ে গেল। চাচা তার থলে থেকে একটি ছোট, নীল রঙের শিশি বের করে মীরার হাতে দিলেন। শিশির ভেতরে যেন নীল রঙের এক আবছা ধোঁয়া ঘুরপাক খাচ্ছিল, যা মৃদু আলো বিকিরণ করছিল। রফিক চাচা বললেন, “এই স্বপ্নটা নাও। এটা এমন এক স্বপ্নের বীজ, যা তোমার ভেতরে নতুন কিছুর জন্ম দেবে। এটা শুধু একটা ছবি দেখাবে না, এটা তোমাকে তোমার নিজের পথের সন্ধান দেবে।” তিনি কোনো দাম চাইলেন না, শুধু বললেন, “একদিন তুমি এর আসল মূল্য বুঝবে, মা।” মীরা শিশিটি নিয়ে অফিসে ফিরে এল। সহকর্মীরা যখন তার হাতে শিশিটি দেখে ফিসফিস করে হাসাহাসি করছিল, কেউ তাকে ‘পাগলের পাল্লায় পড়েছে’ বলে টিপ্পনি কাটছিল, তখন তার মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছিল। তাদের হাসাহাসি তার কানেও পৌঁছাচ্ছিল না। সেই রাতে মীরা যখন ঘুমোতে গেল, শিশিটা বালিশের পাশে সযত্নে রেখে দিল। তার মনে হচ্ছিল, এই শিশিটি যেন তার মনের বন্ধ দরজাগুলো খুলে দিয়েছে, যা সে নিজেও জানত না। ঘুমের মধ্যে সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। সে দেখল, এক বিশাল ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে সে তুলি হাতে ছবি আঁকছে। তার চারপাশের সবকিছু যেন রঙে ভরে উঠেছে, আকাশ, বাতাস, দেয়াল—সবকিছু। প্রতিটি তুলির টানে যেন তার ভেতরের সব অনুভূতি ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে উঠছে। রঙগুলো এতটাই উজ্জ্বল আর প্রাণবন্ত ছিল যে মনে হচ্ছিল যেন ক্যানভাস থেকে বেরিয়ে আসবে। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ—সব রঙ যেন কথা বলছে। সেই ছবি এতটাই সুন্দর ছিল যে তা দেখে মীরার চোখ ভরে এল, তার হৃদয় এক অজানা আনন্দে ভরে উঠল। মীরা কোনোদিন ছবি আঁকেনি, কিন্তু স্বপ্নের সেই অনুভূতি ছিল এতটাই বাস্তব যে ঘুম ভাঙার পরও তার রেশ রয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল, এই নীল শিশিটি যেন তার মনের বন্ধ দরজাগুলো খুলে দিয়েছে, যা সে নিজেও জানত না যে সেগুলো বন্ধ ছিল। পরের দিন মীরা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। তার অফিসে মন বসছিল না, ফাইল আর হিসেবের খাতাগুলো যেন আরও বেশি নিরস লাগছিল। তার মনে বারবার সেই স্বপ্নের কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেই ক্যানভাসের রঙিন দৃশ্য তাকে তাড়া করে ফিরছিল। তার হাত যেন তুলির স্পর্শ চাইছে, তার চোখ চাইছে রঙের খেলা। অফিসের পর সে সরাসরি একটা আর্ট সাপ্লাই স্টোরে গেল। তার হাত নিজের অজান্তেই ড্রইং শিট আর রঙ তুলি বেছে নিল। দোকানদার তার কৌতূহলী চোখে মীরার দিকে তাকিয়ে ছিল, কারণ মীরাকে আগে কখনো এমন দোকানে দেখা যায়নি। প্রথমদিকে তার আঁকা ছবিগুলো ছিল খুবই সাধারণ, তুলির টানগুলো ছিল কাঁচা, রঙগুলো মিশে যেত একাকার হয়ে। সেগুলো কোনো শিল্পের পর্যায়ে পড়ত না, নিছকই এক শিশুর আঁকা ছবির মতো। কিন্তু ধীরে ধীরে তার হাত সাবলীল হতে শুরু করল, তার মনের ভেতরের লুকানো শিল্পী যেন জেগে উঠল। সে বুঝতে পারছিল, এটি শুধু একটা শখ নয়, এটি তার আত্মার প্রয়োজন। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে, রাতের গভীর প্রহর পর্যন্ত সে ছবি আঁকত। তার ঘুম কমতে লাগল, কিন্তু তার মনের শান্তি বাড়তে লাগল। সে আবিষ্কার করল, তার ভেতরের এক সুপ্ত প্রতিভা যেন এতদিন ঘুমিয়ে ছিল, আর সেই নীল শিশির স্বপ্নটা ছিল তার জন্য এক জাগরণ মন্ত্র, এক আলোকবর্তিকা। মীরার বাবা-মা প্রথম দিকে তার এই নতুন শখ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। “অফিসের কাজের পর এসব কী শুরু করলি? ঘুমাবি কখন? স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে যে!” কিন্তু যখন তারা দেখলেন মীরা এই কাজে কতটা আনন্দ পাচ্ছে, তখন তারাও মেনে নিলেন। তার কিছু সহকর্মী এখনও টিপ্পনি কাটত, “স্বপ্ন দেখে শিল্পী হচ্ছে! হাস্যকর!” কিন্তু মীরা তাদের কথায় কান দিত না। তার মনোযোগ ছিল তার তুলি আর রঙের জগতে। কয়েক মাস পেরিয়ে গেল। মীরার আঁকা ছবিগুলোতে এক অদ্ভুত গভীরতা আসতে লাগল। তার ছবিতে থাকত জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলো, যা তার তুলির জাদুতে অসাধারণ হয়ে উঠত—শহরের ফুটপাথে এক বিক্রেতার মুখ, এক বৃদ্ধ দম্পতির হাতে হাত রেখে পথ চলা, বৃষ্টি ভেজা বিকেলের নির্জনতা। তার ছবিগুলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠছিল, যেন প্রতিটি ছবিতে একটি করে গল্প লুকানো থাকত। একদিন তার এক পুরনো বান্ধবী, অনিতা, তার বাড়িতে এসেছিল। মীরার আঁকা ছবিগুলো দেখে অনিতা এতটাই মুগ্ধ হলো যে সে তাকে একটি ছোট স্থানীয় আর্ট গ্যালারিতে তার ছবি দেখানোর পরামর্শ দিল। “মীরা, তোর এই ছবিগুলো শুধু ঘরের কোণে আটকে রাখার জন্য নয়। এগুলো মানুষের দেখা উচিত!” অনিতা জোর দিয়ে বলল। প্রথমদিকে মীরা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল। কিন্তু অনিতার অনুপ্রেরণা আর তার নিজের ভেতরের নতুন শক্তি তাকে রাজি করাল। সে গ্যালারির কিউরেটরের সঙ্গে দেখা করল। কিউরেটর, মিসেস সেন, একজন প্রবীণ শিল্পী এবং একজন কঠোর সমালোচক ছিলেন। মীরার ছবিগুলো দেখে তিনি প্রথমে তেমন প্রভাবিত হননি। কিন্তু মীরার একটি ছবি দেখে তিনি থমকে গেলেন। ছবিটিতে ছিল রাতের শহরের একটি দৃশ্য, যেখানে রাস্তার আলোয় একটি শিশুর স্বপ্নময় মুখ ফুটে উঠেছে। সেই ছবিতে ছিল এক অদ্ভুত মায়া, এক অব্যক্ত ভাষা। মিসেস সেন তার ভেতরের শিল্পীকে চিনতে পারলেন। তিনি মীরাকে তার প্রথম একক প্রদর্শনীর সুযোগ দিলেন, তবে খুব ছোট পরিসরে। প্রদর্শনীর দিন মীরা খুব নার্ভাস ছিল। তার মনে হচ্ছিল, তার ভেতরের সমস্ত গোপন অনুভূতি আজ সবার সামনে উন্মোচিত হবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, দর্শকরা তার ছবিগুলো পছন্দ করল। কিছু ছবি বিক্রিও হলো। মিসেস সেন মীরার পিঠ চাপড়ে বললেন, “তোমার ছবিতে একটা নিজস্বতা আছে, মীরা। এই নিজস্বতা ধরে রেখো।” মীরা বুঝতে পারল, এটা কেবল একটি শুরু। মীরার জীবন সম্পূর্ণরূপে বদলে গেল। সে অফিসের কাজ ছেড়ে দিল, আর তার পুরো সময়টাই ছবি আঁকায় ব্যয় করতে লাগল। এটি ছিল একটি বিশাল ঝুঁকি। তার বাবা-মা তখনও সম্পূর্ণভাবে তার এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেননি। “আর্ট করে কি আর রোজগার হয়? চাকরি ছেড়ে দিবি? পাগল হয়ে গেলি নাকি!” তাদের উদ্বেগ ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু মীরার মনে ছিল এক অদম্য বিশ্বাস। রফিক চাচার সেই স্বপ্ন তাকে যে পথ দেখিয়েছিল, সে পথ থেকে সে আর সরতে পারছিল না। মীরা নিজেকে পুরোপুরি শিল্পের জগতে ডুবিয়ে দিল। সে বিভিন্ন আর্ট ওয়ার্কশপে যোগ দিল, সিনিয়র শিল্পীদের কাছ থেকে শিখল, এবং নিজের স্টাইলকে আরও পরিমার্জন করতে লাগল। তার আঁকা ছবিগুলো এখন শুধু স্থানীয় প্রদর্শনীতেই নয়, শহরের বড় গ্যালারিগুলোতেও স্থান পেতে শুরু করল। তার খ্যাতি ছড়াতে লাগল। সে একজন পরিচিত শিল্পী হয়ে উঠল, যার প্রতিটি ছবির পেছনে থাকত এক গভীর গল্প, এক অদ্ভুত অনুভূতি। তার ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল, সে মানুষের ভেতরের স্বপ্নগুলোকেই যেন ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে পারত। তার ছবিতে থাকত এক অদৃশ্য মায়া, যা দর্শককে তার নিজের স্বপ্নের গভীরে নিয়ে যেত। এই খ্যাতি অবশ্য তার জীবনে নতুন চ্যালেঞ্জও নিয়ে এল। শিল্পকলার জগতে প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র। কিছু প্রতিষ্ঠিত শিল্পী তার দ্রুত উত্থানকে ভালো চোখে দেখল না। তাদের মধ্যে একজন ছিল জয়ন্ত মিত্র, একজন সুপরিচিত এবং কিছুটা অহংকারী বিমূর্ত শিল্পী। জয়ন্ত প্রকাশ্যে মীরার কাজকে “খুবই সরল, আবেগপ্রবণ এবং বাণিজ্যিক” বলে সমালোচনা করত। সে মীরার ছবির মধ্যে “গভীরতার অভাব” খুঁজত। এই সমালোচনাগুলো মীরাকে কষ্ট দিত, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলত। সে জানত, তার শিল্প কোনো গাণিতিক সূত্র বা অ্যাকাডেমিক জ্ঞান দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না, এটা হৃদয়ের ভাষা। এই সময় মীরা রফিক চাচার সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর করল। সে প্রায়শই রফিক চাচার খোঁজ করত, তাকে খুঁজে বের করে তার পাশে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করত। রফিক চাচা তাকে জীবন আর স্বপ্ন সম্পর্কে অদ্ভুত কিছু কথা বলতেন। তিনি বলতেন, “মা, এই জগৎটা শুধু চোখে দেখা বাস্তবতার ওপর টিকে নেই। এর গভীরে রয়েছে কোটি কোটি স্বপ্ন, যা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমার কাজ হলো সেই স্বপ্নগুলোকে খুঁজে বের করা আর সঠিক মানুষকে পৌঁছে দেওয়া।” মীরা জিজ্ঞেস করত, “কিন্তু চাচা, আপনি কীভাবে বোঝেন কোন স্বপ্ন কার জন্য?” রফিক চাচা মৃদু হাসতেন। “আমার চোখগুলো সাধারণ মানুষের চোখ নয়, মা। আমি মানুষের ভেতরের শুষ্ক জমিটা দেখতে পাই, আর সেই জমিতে কী স্বপ্নবীজ প্রয়োজন, সেটাও বুঝতে পারি।” তিনি আরও বলতেন যে প্রতিটি স্বপ্নই তার নিজস্ব পথে মানুষকে চালিত করে, তবে স্বপ্নের কার্যকারিতা নির্ভর করে মানুষের ভেতরের ইচ্ছাশক্তির ওপর। যদি কেউ স্বপ্ন দেখেও সেই স্বপ্নকে বাস্তব করার চেষ্টা না করে, তবে সেই স্বপ্ন শুকিয়ে যায়, মূল্যহীন হয়ে পড়ে। মীরার ছবিতে ক্রমশ রফিক চাচার কথার প্রতিফলন দেখা যেতে লাগল। তার ছবিগুলো এখন শুধু স্বপ্ন নয়, স্বপ্নের বাস্তবায়নের পথে যে সংগ্রাম, যে অধ্যাবসায় প্রয়োজন, সেই বিষয়গুলোও তুলে ধরত। তার ছবিতে থাকত কঠোরতা, থাকত আত্মবিশ্বাস, থাকত এক গভীর আত্মানুসন্ধান। সে বুঝতে পারছিল, তার শিল্প কেবল তার নিজের স্বপ্নকে নয়, রফিক চাচার দেওয়া স্বপ্নের দর্শনকেও যেন বহন করছে। একবার মীরা তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনীর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই প্রদর্শনীটি তাকে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিতি দিতে পারত। কিন্তু এই সময় তার সৃজনশীলতায় এক বড় ধরনের বাধা এল। সে কোনো ছবি আঁকতে পারছিল না, তার রঙগুলো যেন প্রাণহীন হয়ে পড়েছিল, তুলি তার হাতে অনড় মনে হচ্ছিল। এই অবস্থাকে ‘আর্টিস্টস ব্লক’ বলা হয়। মীরা হতাশ হয়ে পড়ল। তার মনে হতে লাগল, রফিক চাচার দেওয়া স্বপ্নের প্রভাব হয়তো শেষ হয়ে গেছে, হয়তো তার প্রতিভা কেবল একটি ক্ষণিকের ঝলক ছিল। এই কঠিন সময়ে মীরা রফিক চাচার কাছে গেল। চাচা মীরার মনের অবস্থা যেন আগেই বুঝেছিলেন। তিনি মীরাকে একটি নতুন শিশি দিলেন, কিন্তু এটি ছিল অন্য সব শিশির থেকে আলাদা। এর ভেতরে কোনো রঙ ছিল না, ছিল শুধু এক স্বচ্ছ জলীয় পদার্থ, যা মৃদু আলো ছড়াচ্ছিল। “এই স্বপ্নটি আলাদা, মা। এটি কোনো নির্দিষ্ট ছবি দেখাবে না। এটি তোমাকে তোমার ভেতরের অন্ধকারকে চিনতে শেখাবে, তোমাকে তোমার নিজের ভেতরের সবচেয়ে কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। এটাই তোমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।” মীরা সেই শিশিটি নিয়ে বাড়ি ফিরল। সেই রাতে সে কোনো স্বপ্ন দেখল না। কিন্তু ঘুম ভাঙার পর তার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এল। সে বুঝতে পারল, তার সৃজনশীলতার মূল উৎসটি বাইরে নয়, সেটি তার নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। তার ব্লকটি এসেছিল আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে, বাজারের চাপ থেকে এবং অন্যদের সমালোচনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া থেকে। সে উপলব্ধি করল, তার নিজের গল্পটাই তার সবচেয়ে বড় শিল্প। সেই দিন থেকে মীরা তার শিল্পকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করল। সে বাণিজ্যিক চাপকে পাশ কাটিয়ে নিজের ভেতরের কথা বলতে শুরু করল। তার পরবর্তী প্রদর্শনীতে সে এমন সব ছবি আঁকল, যা ছিল তার আত্ম-অনুসন্ধানের প্রতিচ্ছবি। সেখানে কোনো রঙবেরঙের স্বপ্ন ছিল না, ছিল কেবল সাদাকালো কিছু রেখাচিত্র, যা মানুষের ভেতরের ভয়, অনিশ্চয়তা এবং তারপর সেই ভয়কে জয় করার ইচ্ছাকে তুলে ধরছিল। এই ছবিগুলো সমালোচকদের মাঝে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলল। জয়ন্ত মিত্রের মতো সমালোচকরাও এবার মীরার শিল্পের গভীরতাকে স্বীকার করতে বাধ্য হলো। মীরা প্রমাণ করল যে শিল্প কেবল সুন্দর স্বপ্ন দেখায় না, এটি বাস্তবতার কঠিন সত্যকেও তুলে ধরতে পারে। মীরার খ্যাতি যখন শহরের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক শিল্প মহলে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, তখন মানুষের মনে রফিক চাচাকে নিয়ে কৌতূহল আরও বাড়ল। মীরা নিজেও রফিক চাচার রহস্যময় অতীত সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠল। তার মনে প্রশ্ন জাগত, কোথা থেকে আসেন এই মানুষটি? কীভাবে তিনি এই অদ্ভুত স্বপ্নগুলো সংগ্রহ করেন? তার জীবনের গল্প কী? এক সন্ধ্যায়, যখন রফিক চাচা শহরের এক নির্জন পার্কের বেঞ্চে বসে ছিলেন, মীরা তার পাশে গিয়ে বসল। “চাচা,” মীরা বলল, “আপনার সম্পর্কে কি কিছু জানতে পারি? আপনার এই স্বপ্ন বিক্রি করার পেছনের গল্পটা কী?” রফিক চাচা মৃদু হাসলেন। তার দৃষ্টি দিগন্তের দিকে নিবদ্ধ ছিল। তিনি যেন অনেক দূরে, অতীতের কোনো স্মৃতির মধ্যে হারিয়ে গেলেন। “আমার গল্প, মা, অনেক পুরোনো। আমি এই শহরের জন্মলগ্ন থেকে আছি, হয়তো তারও আগে থেকে।” তিনি বলতে শুরু করলেন, তার কণ্ঠস্বর যেন দূর অতীতের কোনো প্রাচীন নদীর কুলকুল ধ্বনি। “আমাদের পরিবারে পুরুষানুক্রমে এই কাজ চলে আসছে, মা। আমরা ‘স্বপ্ন-সংগ্রাহক’। আমার পূর্বপুরুষরা হিমালয়ের পাদদেশে এক গোপন গ্রামে বাস করত। সেই গ্রামের প্রতিটি মানুষই জন্ম থেকে স্বপ্নে প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখত, অন্যের স্বপ্নকে স্পর্শ করার, কখনও বা তার পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখত। কিন্তু এই ক্ষমতাকে সহজে ব্যবহার করা যেত না। এর জন্য কঠোর সাধনা আর আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন হতো।” রফিক চাচা বর্ণনা করতে লাগলেন কীভাবে তার পূর্বপুরুষরা চাঁদনি রাতে নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় বসে মানুষের স্বপ্নগুলোকে বাতাসে মিশে থাকা ধুলো কণার মতো সংগ্রহ করত। সেই স্বপ্নগুলোকে বিশেষ উপায়ে মন্ত্রপূত করে কাঁচের শিশিতে সংরক্ষণ করা হতো। “এই শিশিগুলো শুধু কাঁচের তৈরি নয়, মা। এগুলো এক বিশেষ ধরনের পাথর থেকে তৈরি, যা শত শত বছর ধরে পৃথিবীর গভীরে শক্তি সঞ্চয় করে। এই পাথরগুলোই স্বপ্নের শক্তিকে ধরে রাখতে পারে।” এক পর্যায়ে তাদের গ্রামে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। খাদ্য আর জলের অভাবে মানুষ মরতে শুরু করে। সেই সময় আমার পূর্বপুরুষরা সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের এই ক্ষমতাকে শুধুমাত্র নিজেদের গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের স্বপ্ন-সংগ্রহের ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা শহরের মানুষের কাছে শান্তি ও আশা পৌঁছে দেবে, বিনিময়ে মানুষ তাদের খাদ্য ও আশ্রয় দেবে। এভাবেই ‘স্বপ্ন-ফেরিওয়ালা’দের যাত্রা শুরু হয়। “আমি আমার বাবার কাছ থেকে এই বিদ্যা শিখেছি, মা। তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে মানুষের মনকে পড়তে হয়, তার গভীরতম আকাঙ্ক্ষাগুলোকে অনুভব করতে হয়। প্রতিটি মানুষের ভেতরের স্বপ্ন এক এক রকম, আর সেই স্বপ্নকে সঠিকভাবে চিনতে না পারলে সেটা শুধু একটা ফাঁপা কল্পনা হয়েই থেকে যায়।” রফিক চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “কিন্তু এই পথ সহজ ছিল না। পৃথিবীর মানুষ যখন আধুনিকতার দিকে ছুটতে শুরু করল, তখন তারা আমাদের মতো স্বপ্ন ফেরিওয়ালাদের ভুলে যেতে শুরু করল। বিজ্ঞান আর যুক্তিবাদের দাপটে স্বপ্নগুলো কেবল মস্তিষ্কের এক খেলা হয়ে দাঁড়াল। আমাদের পরিবারে অনেকে এই কাজ ছেড়ে দিয়েছিল, সাধারণ মানুষের মতো জীবন বেছে নিয়েছিল।” “আমার মনে আছে, ছোটবেলায় যখন আমার বাবা স্বপ্ন বিক্রি করতে বের হতেন, তখন অনেকেই তাকে উপহাস করত। কিন্তু তিনি কখনো আশা হারাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যত আধুনিকই হোক না কেন, স্বপ্ন ছাড়া তারা বাঁচতে পারে না। স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।” রফিক চাচার চোখে এক অদ্ভুত স্মৃতি ভেসে উঠল। “একবার এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল,” রফিক চাচা বলতে শুরু করলেন। “আমার বাবার কাছে একজন খুব ধনী ব্যবসায়ী এসেছিলেন। তিনি জীবনে সব পেয়েছিলেন, কিন্তু তার মনে কোনো শান্তি ছিল না। তিনি বাবার কাছ থেকে শান্তির স্বপ্ন চাইলেন। বাবা তাকে একটি সাদা শিশি দিলেন, যেখানে ছিল ‘নিরাশার মধ্যে আশার স্বপ্ন’। সেই ব্যবসায়ী প্রথমে হেসেছিলেন, কিন্তু তিনি যখন সেই স্বপ্ন দেখলেন, তখন বুঝতে পারলেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা ছিল অন্যদের জন্য কিছু না করা। তিনি তার সব সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে শুরু করলেন এবং জীবনে সত্যিকারের শান্তি পেলেন। সেই দিনের পর থেকে আমি এই বিদ্যার ওপর আরও বেশি বিশ্বাস স্থাপন করি।” রফিক চাচা মীরার দিকে তাকালেন। “তোমার মতো মানুষেরা, মা, যারা আমার স্বপ্নগুলোকে শুধু কল্পনা হিসেবে নেয়নি, বরং তাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জীবনকে বদলে দিয়েছে, তারাই আমার এই পুরোনো বিদ্যার শেষ আশ্রয়। তোমার ছবিগুলো যেন আমার স্বপ্নেরই প্রতিচ্ছবি। তুমি যখন তোমার ছবিতে মানুষের লুকানো স্বপ্নগুলো ফুটিয়ে তোলো, তখন সেটা যেন আমার কাজেরই একটা অংশ হয়ে ওঠে।” মীরা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। রফিক চাচার গল্প তার মনের ভেতর এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। সে বুঝতে পারল, রফিক চাচা শুধু একজন স্বপ্ন বিক্রেতা নন, তিনি ছিলেন প্রাচীন জ্ঞানের এক ধারক, যিনি আধুনিকতার গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়া মানবাত্মার জন্য এক আশা-প্রদীপ জ্বেলে রেখেছিলেন। রফিক চাচার গল্প মীরার শিল্পকে আরও এক নতুন মাত্রা দিল। তার ছবিগুলো এখন শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রকাশ ছিল না, সেগুলো যেন মানব সভ্যতার সম্মিলিত স্বপ্নের এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে উঠল। সে তার ছবিতে প্রাচীন রহস্য আর আধুনিক জীবনের টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলতে লাগল। তার নতুন সিরিজ, যার নাম ‘ড্রিমস্ক্যাপস’, বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হলো। এই সিরিজে সে রফিক চাচার দেওয়া বিভিন্ন স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে ছবি আঁকত—ভালোবাসার স্বপ্নকে লাল রঙে, আশার স্বপ্নকে সোনালী রঙে, এবং শান্তির স্বপ্নকে নীল রঙে রূপায়িত করত। তবে, খ্যাতি এবং বাণিজ্যিক সাফল্য প্রায়শই নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। আর্ট গ্যালারির মালিকরা, বিনিয়োগকারীরা, এবং আর্ট সমালোচকরা মীরার উপর চাপ সৃষ্টি করতে লাগল। তারা চাইছিল মীরা ‘ড্রিমস্ক্যাপস’ এর ফর্মুলা ধরে রেখে একঘেয়েভাবে একই ধরনের ছবি আঁকতে থাকুক, কারণ সেগুলো ভালো বিক্রি হচ্ছিল। “মীরা, তোমার এই ড্রিম-পেইন্টিংগুলোই তো তোমার ইউএসপি! এগুলোই তো মানুষ ভালোবাসছে!” গ্যালারির মালিক তাকে প্রায়শই ফোন করে বলতেন। কিন্তু মীরা তার শিল্পকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করতে রাজি ছিল না। সে অনুভব করল, এই চাপ তার সৃজনশীলতাকে গলা টিপে ধরছে, তার আত্মাকে পীড়িত করছে। তার তুলিগুলো যেন জোর করে নাচানো হচ্ছে। তার মনে হলো, সে যেন রফিক চাচার স্বপ্নের অপব্যবহার করছে। রফিক চাচা তাকে যে স্বপ্ন দিয়েছিলেন, তার উদ্দেশ্য ছিল আত্মার জাগরণ, অর্থ উপার্জন নয়। এক সময় মীরা এক বড় ধরনের মানসিক চাপে পড়ল। তার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটল, সে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখতে লাগল—এক বিশাল কালো ক্যানভাস, যেখানে সে কোনো রঙ দিতে পারছে না, তার তুলিগুলো ভাঙা, আর চারপাশে অজস্র মানুষের হতাশ চোখ। এই দুঃস্বপ্ন তাকে আতঙ্কিত করে তুলল। সে বুঝতে পারল, তার ভেতরের শিল্পী সত্তাটা বিপদে আছে। এই দুঃসময়ে রফিক চাচা হঠাৎ করেই যেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তাকে আর শহরের কোথাও দেখা যাচ্ছিল না। মীরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। তার মনে হলো, রফিক চাচা হয়তো তাকে ছেড়ে চলে গেছেন, অথবা তার কোনো বিপদ হয়েছে। তার অনুপস্থিতি মীরাকে আরও একা করে তুলল। রফিক চাচা ছিলেন তার একমাত্র আশ্রয়, তার মেন্টর। মীরা রফিক চাচার খোঁজ করতে শুরু করল। সে শহরের প্রতিটি অলিগলি, পার্ক, পুরনো স্থাপত্যের কাছে গেল, যেখানে সে আগে রফিক চাচাকে দেখেছিল। দিন পেরিয়ে রাত হলো, কিন্তু রফিক চাচার কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। মীরা তার পুরনো বন্ধুদের সাহায্য চাইল, এমনকি পুলিশের কাছেও গেল, কিন্তু রফিক চাচার মতো একজন ‘পাগল’ স্বপ্ন ফেরিওয়ালার খোঁজ করার আগ্রহ কারো ছিল না। প্রায় এক সপ্তাহ পর, গভীর রাতে মীরা তার স্টুডিওতে একা বসে ছিল। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। তার মনে হচ্ছিল, তার শিল্পী জীবনটা এখানেই শেষ হয়ে যাবে। হঠাৎই তার দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। মীরা ভয়ে ভয়ে দরজা খুলল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন রফিক চাচা, বৃষ্টিতে ভেজা, তার মুখ ফ্যাকাশে। তার হাতে ছিল না সেই মখমলের থলে, ছিল না কাঁচের শিশি। তার চোখ ছিল কেমন যেন বিষণ্ণ। “চাচা! আপনি কোথায় ছিলেন? আমি কত খুঁজেছি আপনাকে!” মীরা প্রায় কেঁদে ফেলেছিল। রফিক চাচা কাঁপতে কাঁপতে ভেতরে ঢুকলেন। “সময় শেষ হয়ে আসছে, মা। আমার জীবনের আলো নিভে আসছে।” মীরা তাকে বসাল, উষ্ণ চা দিল। রফিক চাচা বললেন, “আমি বুঝতে পারছিলাম, মা, আমার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে আসছে। আমার শরীর আর এই চাপ নিতে পারছে না। স্বপ্ন সংগ্রহ করা, সেগুলোকে সংরক্ষণ করা—এগুলো এখন আমার জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। মানুষও এখন আর স্বপ্ন দেখে না, তারা শুধু হিসেব করে। আমার এই বিদ্যা, আমার এই জীবন, এখন শেষ হতে চলেছে।” মীরা জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু চাচা, আপনি না থাকলে কে স্বপ্ন বিক্রি করবে? মানুষের স্বপ্ন দেখাবে কে?” রফিক চাচার চোখে এক অদ্ভুত আলো ঝলসে উঠল। তিনি মীরার দিকে তাকালেন। “আমি তো একজন স্বপ্ন ফেরিওয়ালা, মা। আমার কাজ শেষ হলেও, স্বপ্নের কাজ শেষ হবে না। আমার স্বপ্নগুলোকে তুমি তোমার তুলির মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখবে, মীরা। তোমার ছবিগুলোই হবে নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন ফেরিওয়ালা। তুমি তোমার ছবিতে আমার দেখা স্বপ্নগুলোকে ফুটিয়ে তুলবে, তুমি মানুষকে দেখাবে যে এই যান্ত্রিক পৃথিবীতেও স্বপ্ন বেঁচে থাকে।” তিনি তার পকেট থেকে একটি ছোট, সোনালী রঙের শিশি বের করলেন। এটি ছিল অন্য সব শিশির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি যেন ভেতর থেকে উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছিল। “এইটা আমার শেষ স্বপ্ন, মা। এটা শুধু একটি স্বপ্ন নয়, এটা হলো ‘আশার বীজ’। যখন তোমার মনে হবে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে, যখন তুমি তোমার পথ হারাবে, তখন এই স্বপ্নটি দেখবে। এটা তোমাকে তোমার ভেতরের সব প্রশ্নের উত্তর দেবে।” সেই রাতে রফিক চাচা মীরার স্টুডিওতে রাত কাটালেন। তারা সারারাত গল্প করলেন, রফিক চাচা তার জীবনের আরও কিছু রহস্য আর স্বপ্নের কথা বললেন। মীরা অনুভব করল, তার সামনে এক কিংবদন্তি জীবনের শেষ প্রহর কাটাচ্ছেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই, যখন শহর তখনও ঘুমিয়ে ছিল, রফিক চাচা মীরাকে বিদায় জানালেন। “নিজের পথ খুঁজে বের করো, মা। তোমার শিল্পই তোমার পথ।” এই বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন। মীরা জানালা দিয়ে দেখল, রফিক চাচা শহরের কোলাহলপূর্ণ গলিপথে মিশে গেলেন, যেন তিনি কোনো দিন ছিলেনই না। তার চোখে একরাশ শূন্যতা আর বুকে এক অদ্ভুত উপলব্ধি নিয়ে মীরা দাঁড়িয়ে রইল। রফিক চাচার চলে যাওয়া মীরাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করল। তার অনুপস্থিতি তাকে এক বিশাল শূন্যতার মধ্যে ফেলে দিল, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে এক নতুন উদ্দেশ্যও দিল। রফিক চাচার শেষ কথাগুলো তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল: “তোমার ছবিগুলোই হবে নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন ফেরিওয়ালা।” মীরা সেই সোনালী শিশিটি সাবধানে রাখল। সে বুঝতে পারল, এখন তার শিল্পকে আরও বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে। সে বাণিজ্যিক চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করল। গ্যালারির মালিকদের সাথে তার চুক্তি বাতিল করল, যা তাকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করল, কিন্তু তার আত্মাকে মুক্তি দিল। সে এখন নিজের জন্য ছবি আঁকবে, মানুষের জন্য আঁকবে, কিন্তু শিল্পের পবিত্রতা বজায় রেখে। এরপর মীরা তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ আঁকা শুরু করল, যার নাম দিল ‘লস্ট ড্রিমস, ফাউন্ড হোপ’ (Lost Dreams, Found Hope)। এই সিরিজে সে শুধু রঙবেরঙের স্বপ্ন নয়, বরং স্বপ্ন হারানোর বেদনা, অনিশ্চয়তার অন্ধকার এবং তার মধ্য থেকে আবার আশার আলো খুঁজে পাওয়ার সংগ্রামকে ফুটিয়ে তুলল। তার ছবিতে ছিল রফিক চাচার সেই রহস্যময় গ্রাম, তার ফেলে আসা স্মৃতি, এবং তার দেওয়া শেষ স্বপ্ন। তার তুলিতে ফুটে উঠত এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিকতা, যা দর্শককে নিজেদের ভেতরের গভীরতম অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করাত। তার এই নতুন কাজ ছিল প্রচলিত শিল্প ধারণার বাইরে। এতে ছিল না কোনো চটকদার রঙ, ছিল কেবল সাদাকালো এবং ধূসর রঙের ব্যবহার, যা মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলত। আর্ট সমালোচকরা প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তার এই নতুন কাজের গভীরতাকে তারা উপলব্ধি করতে পারল। জয়ন্ত মিত্রও এবার মীরার শিল্পকে সাধুবাদ জানাল, তার শিল্পে নতুন গভীরতা এসেছে বলে মন্তব্য করল। মীরা শুধু ছবি আঁকায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখল না। সে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে গিয়ে তরুণদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। সে তাদের বোঝাত যে স্বপ্ন দেখাটা কতটা জরুরি, কিন্তু শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না, সেই স্বপ্নকে বাস্তব করার জন্য কঠোর পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন। সে রফিক চাচার গল্প বলত, তার দেওয়া স্বপ্নগুলোর কথা বলত। তার কথাগুলো তরুণদের মধ্যে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করল। অনেকেই তার কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলল। মীরা উপলব্ধি করল, রফিক চাচা তাকে শুধু একজন শিল্পী বানাননি, তিনি তাকে একজন ‘আশাবাদীর বার্তাবাহক’ বানিয়েছিলেন। তার নিজের শিল্পকর্মই এখন ছিল নতুন যুগের স্বপ্ন ফেরিওয়ালা। সে আর স্বপ্ন বিক্রি করত না, কিন্তু তার প্রতিটি ছবি যেন হাজারো মানুষের মনে নতুন স্বপ্ন বপন করত। বছর পেরিয়ে গেল। মীরা এখন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী। তার কাজ নিয়ে বড় বড় গ্যালারিতে প্রদর্শনী হয়, তার বই প্রকাশিত হয়। কিন্তু সে তার শিকড় ভোলে না। সে প্রায়শই শহরের সেই পুরোনো পার্কের বেঞ্চে যায়, যেখানে সে শেষবার রফিক চাচার সঙ্গে কথা বলেছিল। সেখানে বসে সে পুরোনো দিনের কথা ভাবে, আর নিজের ভেতরের রফিক চাচার দেওয়া আশার বীজ অনুভব করে। একদিন, মীরা যখন তার স্টুডিওতে একটি নতুন ছবি আঁকছিল, তার মনে হলো, এখন সেই সোনালী শিশিটি দেখার সময় এসেছে। সে শিশিটি বের করল, যা এত বছর ধরে তার কাজের টেবিলের এক কোণে সযত্নে রাখা ছিল। শিশিটি হাতে নিয়ে সে চোখ বন্ধ করল, রফিক চাচার শেষ কথাগুলো তার কানে বাজতে লাগল: “যখন তোমার মনে হবে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে, যখন তুমি তোমার পথ হারাবে, তখন এই স্বপ্নটি দেখবে।” মীরা ধীরে ধীরে শিশিটির ঢাকনা খুলল। ভেতরে কোনো রঙবেরঙের আলো ছিল না, কোনো দৃশ্যও ফুটে উঠল না। তার বদলে মীরা অনুভব করল এক গভীর প্রশান্তি, এক পরম নীরবতা। তার মনে ভেসে উঠল রফিক চাচার হাসি, তার শান্ত চোখ, আর তার সেই অদম্য বিশ্বাস। মীরা বুঝল, এই স্বপ্ন কোনো দৃশ্য দেখানোর জন্য ছিল না। এই স্বপ্ন ছিল আত্মবিশ্বাস, সাহস, আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি, যা রফিক চাচা তার মধ্যে রোপণ করে দিয়েছিলেন। এই স্বপ্ন তাকে শিখিয়েছিল, বাইরের কোনো জাদু নয়, ভেতরের শক্তিই মানুষকে তার সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলো পূরণ করতে সাহায্য করে। মীরা তার তুলি হাতে নিল। তার নতুন ছবিতে কোনো শিশি ছিল না, কোনো স্বপ্ন ফেরিওয়ালাও ছিল না। ছিল শুধু এক উজ্জ্বল দিগন্ত, যেখানে সূর্য উঠছে, আর তার আলোয় একাকী একজন নারী হেঁটে চলেছে তার নিজের পথ ধরে, তার চোখে আশার প্রদীপ জ্বলছে। মীরা জানত, রফিক চাচা হয়তো সশরীরে আর নেই, কিন্তু তার স্বপ্নগুলো বেঁচে আছে মীরার শিল্পে, বেঁচে আছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে, যারা এখনও স্বপ্ন দেখে, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তব করার সাহস রাখে। এই গল্প যেন বলে, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা কখনো হারিয়ে যায় না, তারা শুধু নতুন রূপে, নতুন মাধ্যমে, মানুষের জীবনে ফিরে আসে।

Share this story

Comments

Discussion

No comments

Please sign in to join the discussion