Episode 6719 words0 views

গঙ্গার ধারে শেষ রাত : ষষ্ঠ অধ্যায়

দরজাটা খুলতেই বাইরের তাজা বাতাস অনিন্দিতার মুখে ঝাপটা মারল, কিন্তু সেটা ফুসফুসে পৌঁছানোর আগেই জমে বরফ হয়ে গেল। তার পেছনে, বাড়ির ভেতর থেকে ছুটে আসছিল পার্থসারথির হিংস্র গর্জন, যা কোনো মানুষের নয়, বরং এক আহত, কোণঠাসা পশুর। অনিন্দিতা বুঝতে পারছিল, আহত বাঘ আরও ভয়ঙ্কর। সে বাড়ির বিশাল, অন্ধকার লন পেরিয়ে গেটের দিকে ছুটল। চাঁদের আলোয় আগাছায় ভরা বাগানটাকে একটা বিভ্রম (illusion)-এর মতো দেখাচ্ছিল, যেখানে প্রতিটি ঝোপঝাড় এক-একটি ওঁত পেতে থাকা দানব। কিন্তু পুরনো দিনের ভারী লোহার গেটটাও ভেতর থেকে বন্ধ। সে যখন মরিয়া হয়ে গেটের ভারী, মরচে-ধরা ছিটকিনিটা ধরে টানাটানি করছে, তখন পার্থসারথি প্রায় তার কাছে এসে পড়েছে। তার হাতে সেই পান্নাখচিত তরবারিটা, যেটা সে নিচে ফেলে এসেছিল। লোকটার সবুজ চোখ দুটো অন্ধকারে পিশাচের মতো জ্বলছে, আহত হাত থেকে রক্ত ঝরে তার পাঞ্জাবি ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তার মুখে এক পৈশাচিক হাসি। “কোথায় পালাবে, অনিন্দিতা? এই বাড়ির প্রতিটি ঘাস আমার চেনা। এই গুপ্তধন আমার, আর তুমি তার শেষ সাক্ষী।” অনিন্দিতা মরিয়া হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। পালানোর কোনো পথ নেই। হঠাৎ তার চোখ গেল বাগানের এক কোণে রাখা একটা পুরনো মইয়ের দিকে। প্রোমোটারের লোকজনেরা হয়তো বাড়ির মাপজোক করতে এসে ফেলে গেছে। পার্থসারথি তরবারিটা তোলার আগেই অনিন্দিতা সাপের মতো ঘুরে মইটার দিকে দৌড় দিল। মইটা টেনে সে কোনোমতে বাড়ির নিচু কার্নিশের পাঁচিলে লাগাল। তারপর বাঁদরের মতো দ্রুততায় মই বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। “এই খেলাটা তুমি শেষ করতে পারবে না!”—পার্থসারথি চিৎকার করে মইয়ের তলায় এসে পৌঁছাল। সে এক হাতেই মই বেয়ে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল, তার অন্য হাত থেকে রক্ত ঝরছিল। অনিন্দিতা ততক্ষণে পাঁচিলের ওপর উঠে পড়েছে। কিন্তু সেখান থেকে নামার কোনো উপায় নেই। সে পাঁচিলের ওপর দিয়েই দৌড়ে দোতলার সেই বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল, যেখানে সে প্রথম ছায়ামূর্তি দেখেছিল। বারান্দাটা অরিন্দম সেনের লাইব্রেরির সাথে যুক্ত। অনিন্দিতা কাঁচের দরজা ঠেলে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে পড়ল। তার মাথায় তখন বিদ্যুৎ খেলে গেছে। ভয় নয়, এখন কাজ করছে শুধু বেঁচে থাকার আদিম প্রবৃত্তি। সে দ্রুত তার দাদুর লেখার টেবিলের কাছে গেল। টেবিলের ওপর রাখা ক্রিস্টালের ভারী পেপারওয়েটটা হাতে তুলে নিল। তারপর লাইব্রেরির দরজার ঠিক পেছনে, দেয়ালের সাথে মিশে গিয়ে অন্ধকারে লুকিয়ে পড়ল। নিঃশ্বাস বন্ধ, হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে এসে লাফাতে শুরু করেছে। একটু পরেই পার্থসারথি টলতে টলতে ঘরে ঢুকল। তার শরীর থেকে রক্ত ঝরে ঘরের দামী কার্পেটে কালো ছোপ ফেলছে। সে অনিন্দিতাকে দেখতে না পেয়ে রাগে গরগর করতে লাগল। “বেরিয়ে আয়! লুকিয়ে কোনো লাভ হবে না! এই বাড়ির প্রতিটি ধুলোকণা আমার পূর্বপুরুষের। তুই এখানে বহিরাগত!” সে যখন টেবিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, দাদুর বইয়ের তাকগুলো দেখছে, ঠিক সেই মুহূর্তে অনিন্দিতা দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে পেপারওয়েটটা দিয়ে পার্থসারথির ঘাড়ে, কানের ঠিক নিচে আঘাত করল। আঘাতটা মারাত্মক ছিল। পার্থসারথি যন্ত্রণায় অস্ফুট চিৎকার করে ঘুরে দাঁড়াতেই তার পা টেবিলের পায়ায় লেগে সে টাল সামলাতে পারল না। তার শরীরটা গিয়ে পড়ল জানলার বিশাল কাঁচের ওপর। একটা তীব্র, কান ফাটানো শব্দ করে কাঁচ ভেঙে গেল। মুহূর্তের জন্য, পার্থসারথির শরীরটা ভাঙা কাঁচের ফ্রেমে আটকে রইল, তার পেছনে পূর্ণিমার চাঁদ। তার সবুজ চোখে বিস্ময় আর অবিশ্বাস। তারপর, মাধ্যাকর্ষণের টানে তার শরীরটা সেই ভাঙা কাঁচ দিয়ে সোজা দোতলা থেকে নিচের পাথরের চাতালে গিয়ে পড়ল। একটা চূড়ান্ত, ভারী শব্দ। তারপর সব শান্ত। মৃত্যু এসে তার শীতল চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। অনিন্দিতা কাঁপতে কাঁপতে ভাঙা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে, পার্থসারথির নিথর দেহটা একটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে পড়ে আছে। তার পাশে পড়ে থাকা তরবারির পান্নাটা তখনও চাঁদের আলোয় শেষবারের মতো চিকচিক করছে। ঠিক তখনই, বাড়ির গেটের বাইরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল। ভোলাদা, এত গোলমালে যার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, সে-ই পুলিশে খবর দিয়েছিল। এক মাস পর। সেন বাড়ি এখন শান্ত। অনিন্দিতা ঠিক করেছে, সে এখানেই থাকবে। বাড়িটা সারানোর কাজ শুরু হয়েছে। রাধাকান্ত সেনের ডায়েরি আর জ্যাঁ-পিয়েরের চিঠি সে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। পার্থসারথি দ্যুবইসের আসল পরিচয় এবং অরিন্দম সেনের মৃত্যুরহস্য এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আর গুপ্তধন? অনিন্দিতা তার দাদুর শেষ ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়েছে। ভারত সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাহায্যে সেই অমূল্য সম্পদ এখন জাতীয় সংগ্রহশালায় সুরক্ষিত। তার বিনিময়ে পাওয়া টাকায় সে অরিন্দম সেনের নামে একটি চ্যারিটেবল ট্রাস্ট খুলেছে, যা দুঃস্থ লেখক এবং গবেষকদের সাহায্য করবে। আজ পূর্ণিমার রাত। অনিন্দিতা লাইব্রেরির সেই ভাঙা জানলার ধারে এসে দাঁড়াল। জানলাটা এখন নতুন করে লাগানো হয়েছে। গঙ্গার জলে চাঁদের আলো পড়ে রুপোলি পথ তৈরি হয়েছে। তার মনে হলো, তার দাদু যেন সেই পথ ধরে হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ‘লিলির রক্ষক’-এর অভিশাপ শেষ। গঙ্গার ধারে সেই শেষ রাতের আঁধার কেটে গিয়ে এক নতুন সকাল এসেছে। অনিন্দিতা জানে, তার লড়াই শেষ হয়েছে, কিন্তু তার নতুন জীবন সবে শুরু হলো। এই বাড়ি, এই গঙ্গা, আর তার দাদুর স্মৃতিকে আগলে রেখেই সে বাকি পথটা চলবে। ~সমাপ্ত ~

Share this story

Comments

Discussion

No comments

Please sign in to join the discussion