মুখোশের আড়ালে
সময় যেন থেমে গেছে। অনিন্দিতা সিন্দুকের আড়ালে পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। তার প্রতিটি স্নায়ু টানটান। গোপন কুঠুরির ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে বাতাস তার ফুসফুসকে জমাট করে দিচ্ছিল। পুরনো সোনা আর ভেজা মাটির এক অদ্ভুত ধাতব গন্ধ নাকে আসছিল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসা ছায়ামূর্তিটা अबার ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। লোকটার হাতে থাকা শক্তিশালী টর্চের আলোয় ঘরের ধুলোকণাগুলো জীবন্ত হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। লোকটা প্রথমে খোলা সিন্দুকগুলোর দিকে তাকাল। তার মুখ থেকে একটা চাপা হিসহিসানির মতো শব্দ বেরিয়ে এল, যা ছিল একই সাথে উল্লাস আর অধৈর্যের মিশ্রণ।
সে এগিয়ে গিয়ে স্বর্ণমুদ্রার সিন্দুকে হাত দিল, মুদ্রার ওপর দিয়ে আঙুল বোলাতে লাগল যেন বহু প্রতীক্ষিত কোনো প্রিয়জনকে স্পর্শ করছে। তারপর গয়নার সিন্দুকটা দেখল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ফুটে বেরোচ্ছে বংশপরম্পরায় বয়ে চলা এক তীব্র লোভ। অনিন্দিতা বুঝতে পারছিল, লোকটা গুপ্তধনের জন্যই এসেছে।
হঠাৎ, সেই শীতল, তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরটা অন্ধকার চিরে বেরিয়ে এল। “আমি জানতাম, তুমিই আমাকে এখানে পথ দেখিয়ে আনবে, অনিন্দিতা।”
অনিন্দিতা চমকে উঠল। এই গলা তার চেনা। এক মুহূর্তের জন্য তার মস্তিষ্ক বিশ্বাস করতে চাইল না। সে অবিশ্বাস্য চোখে সিন্দুকের ফাঁক দিয়ে লোকটার দিকে তাকাল। টর্চের আলোটা এবার লোকটার মুখের ওপর পড়েছে।
অধ্যাপক পার্থসারথি ঘোষ।
তার সেই সৌম্য, বিদ্বান চেহারাটা এখন আর নেই। তার জায়গায় ফুটে উঠেছে এক হিংস্র, কুটিল অভিব্যক্তি। আর তার চোখ দুটো—সেই পান্না সবুজ চোখ—এখন অন্ধকারে জ্বলছে, যেন কোনো শিকারি জন্তু তার শিকারকে কোণঠাসা করে ফেলেছে।
“অবাক হচ্ছো, তাই না?” পার্থসারথি ব্যঙ্গ করে হাসল, তার কণ্ঠস্বরে মিশে ছিল ক্রূরতা। “ভাবছ, যে তোমাকে সাহায্য করার ভান করছিল, সে-ই তোমার দাদুর খুনি? আসলে, দ্যুবইস পরিবারের রক্ত আমার শরীরে। আমার আসল নাম পার্থসারথি দ্যুবইস। আমার পূর্বপুরুষরা, সেই জ্যাঁ-পিয়েরের সঙ্গীরা, এই গুপ্তধনের জন্য অপেক্ষা করে গেছে। আমিও করছিলাম। কিন্তু তোমার দাদু বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল।”
অনিন্দিতা ভয়ে, ঘৃণায় কথা বলতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। যে মানুষটাকে সে বিশ্বাস করেছিল, যার জ্ঞানের ওপর ভরসা করে সে এতদূর এগিয়েছে, সে-ই কি না এক ছদ্মবেশী খুনি!
পার্থসারথি বলতে লাগল, “তোমার দাদু এই গুপ্তধনের কথা জানতে পেরে গেছিল। আর সে ঠিক করেছিল, এই সম্পদ ভারত সরকারকে দিয়ে দেবে। কী মহান দেশপ্রেমিক! ফ্রান্সের সম্পদ, ফরাসি বংশধরদের সম্মান, সে এসবের কিছুই বুঝত না। তাই তাকে সরাতে হলো। আমিই তাকে শেষবার দেখা করতে এসেছিলাম, একজন গুণমুগ্ধ গবেষক হিসেবে। চায়ের কাপে মিশিয়ে দিয়েছিলাম সেই বিষ, যা আমাদের পরিবার বংশপরম্পরায় তৈরি করে আসছে। এক ধরণের অ্যালকালয়েড, যা হৃদস্পন্দনকে ধীরে ধীরে থামিয়ে দেয়। এমন বিষ, যার কোনো চিহ্ন থাকে না।”
“কিন্তু… চিনির দানা?” অনিন্দিতা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ।
পার্থসারথি হাসল, সে এক বীভৎস হাসি। “ওটা একটা ভুল। আমার নির্বুদ্ধিতা। তাড়াহুড়োয় আমারই হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, কেউ খেয়াল করবে না। কিন্তু তুমি করলে। তোমার সাংবাদিকের চোখ, তাই না? তোমার দাদুর মতোই। সে-ও বোদলেয়ারের বইতে আমার জন্য একটা বার্তা রেখে গিয়েছিল—‘তোমার সবুজ চোখ থেকে যে বিষ ঝরে পড়ে’। সে আমাকে বোঝাতে চেয়েছিল, সে সব জানে। আমাকে উপহাস করেছিল! তাই তার মৃত্যুটা আরও জরুরি হয়ে পড়েছিল।”
তার কথা শেষ হতেই সে অনিন্দিতার দিকে ঘুরল। “আমিই সেই ছায়ামূর্তি, যাকে তুমি বারান্দায় দেখেছিলে। তোমাকে অনুসরণ করা, তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ করা—এতে একটা অদ্ভুত আনন্দ ছিল। তুমি আমার হয়েই কাজ করছিলে, অথচ তুমি জানতেও না। যাই হোক, অনেক কথা হলো। এবার তোমার পালা। এই গুপ্তধনের কথা তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই তোমাকেও তোমার দাদুর কাছে যেতে হবে।”
পarthasarathi পকেট থেকে একটা ছোট শিশি বের করল। সে ধীরে ধীরে অনিন্দিতার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। অনিন্দিতা বুঝল, পালানোর আর কোনো পথ নেই। তার পিঠ সিন্দুকে ঠেকে গেছে। মৃত্যু নিশ্চিত।
হঠাৎ তার চোখ গেল তৃতীয় সিন্দুকটার দিকে। পান্নাখচিত সেই তরবারিটা এখনও সেখানে রাখা। মরিয়া হয়ে সে একটা শেষ চেষ্টা করল। পার্থসারথি যখন তার প্রায় কাছে এসে গেছে, তখন সে আচমকা নিচু হয়ে সিন্দুক থেকে ভারী তরবারিটা তুলে নিল।
তরবারিটা এতটাই ভারী যে সে ঠিকমতো তুলতেও পারছিল না। কিন্তু অ্যাড্রেনালিনের ক্ষরণে তার শরীরে তখন অসুরের শক্তি। সে গায়ের জোরে তরবারিটা পার্থসারথির দিকে চালিয়ে দিল।
পার্থসারথি এমনটা আশা করেনি। সে চকিতে পিছিয়ে যেতেই তরবারির ডগাটা তার হাতে গভীর একটা ক্ষত তৈরি করল। তার হাত থেকে বিষের শিশিটা ছিটকে পাথরের মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল।
এই সুযোগ!
অনিন্দিতা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে আহত পার্থসারথিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল। তার পেছনেই পার্থসারথির যন্ত্রণাকাতর, হিংস্র চিৎকার শোনা যাচ্ছে।
“তোকে আমি ছাড়ব না!”
অনিন্দিতা কোনোমতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। তারপর গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই চৌকো পাথরের স্ল্যাবটা টেনে আগের জায়গায় বসিয়ে দিল। একটা ভারী শব্দ করে স্ল্যাবটা বন্ধ হয়ে গেল। পার্থসারথি আপাতত নিচে আটকা পড়েছে।
কিন্তু অনিন্দিতা জানে, এই বাধা বেশিক্ষণের জন্য নয়। সে বাড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করল। তার শরীর কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। সে এখন একটা খুনিকে তারই বাড়িতে বন্দি করে ফেলেছে। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোনোর পথ একটাই। আর সেই পথে যাওয়ার আগেই হয়তো পার্থসারথি বেরিয়ে আসবে।
সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে সদর দরজার দিকে ছুটল। কিন্তু দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। উত্তেজনায় তার হাত এতটাই কাঁপছিল যে সে ছিটকিনিটা ধরতেও পারছিল না। কয়েকবার চেষ্টার পর সে ছিটকিনিটা খুলল, কিন্তু পুরনো দিনের ভারী দরজাটা খুলতে গিয়ে তার সব শক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই, পেছনের ফোয়ারার দিক থেকে পাথর সরানোর সেই ভয়ঙ্কর শব্দটা আবার ভেসে এল। তার মানে, পার্থসারথি বেরিয়ে পড়েছে।
(চলবে)
Comments
Discussion
No commentsPlease sign in to join the discussion